বেরিয়ে আসতে হবে

এককালে জনৈক ইংরেজ খেলোয়াড় মার্টিন জনসন বলেছিলেন- ইংল্যান্ডের মূল সমস্যা তিনটি। তারা ব্যাটিং করতে জানে না, বোলিং করতে জানে না, ফিল্ডিং করতে জানে না। সে-ইংল্যান্ড টিমের তুলনায় বর্তমান বাংলাদেশ টিম দুটি ধাপ এগিয়ে আছে, যেহেতু এদের মূল সমস্যা একটি- এরা ব্যাটিং করতে জানে না। বোলিং করতে এবং ফিল্ডিং করতে জানলেও ২০১১ সালের ১৯ মার্চের খেলায় তাদের প্রথমটি ছিল না পেনিট্রেইটিং কিংবা ব্যাটিংভেদী, দ্বিতীয়টিও ছিল না নিজেদের শ্রেষ্ঠ মানের সমান শার্প বা তীক্ষ। তবু ২৮৪ রান তাড়া করা অসম্ভব তো ছিল না। তা তো এই সাউথ আফ্রিকাই করে জয় পেয়েছে আগের ম্যাচে এবারের বিশ্বকাপের হট ফেভারিট ভারতের বিরুদ্ধে। তাদেরই বিরুদ্ধে আরো ৫৪ রান বেশি তাড়া করে ম্যাচ ড্র করেছে এবারকার অন্যতম শিরোপা প্রত্যাশী ইংল্যান্ড।

মাঠের একক ক্ষমতাধর দলনেতা ওপেনিং স্পেলে ডানহাতি পেসার এবং বাঁহাতি স্পিনারের কম্বিনেশনে আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিলে আর্লি ব্রেক আর রানের স্পিড-ব্রেকের ডবল বোনাসে বাকি স্পিনারদের ওপর চাপ লাঘবের প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ হয়তো ৫০/৫৫ রান কম তাড়া করে ২০৬ রানের বদলে ১৫২ রানের হার অর্জন করতো। কিন্তু তাতেও কোনো সান্ত¦না থাকতো কী? মোদ্দা কথা- যেটা লিখতে পারবো ভেবেছিলাম, সেটা লিখতে পারলাম না। লিখতে না পারলেও জানাতে তো পারি কথাটা কী ছিল। ইংল্যান্ড, আয়ার্ল্যান্ড আর সাউথ আফ্রিকার সঙ্গে পরপর তিনটি ম্যাচে জেতার পরে আমার লিখিতব্য ছিল বাংলাদেশ হ্যাজ অ্যারাইভড বা বাংলাদেশ এসে গেছে। এর বদলে এখন লিখতে হচ্ছে- বাংলাদেশকে বেরিয়ে আসতে হবে এই পাকিস্তানি সিনড্রোম থেকে, না হলে এদেশ কোনোদিনই পৌঁছাতে পারবে না।

পাকিস্তানি সিনড্রোম কী? সকলে সমস্বরে বলবেন- ধারাবাহিকতাহীনতা। না, একটু ভুল হল। শুদ্ধ উত্তর হবে- স্থায়ী ধারাবাহিকতাহীনতা। অস্থায়ী ধারাবাহিকতাহীনতার শিকার সকল দলই হয় সময় সময়। কিন্তু বয়সে বাংলাদেশ টিমের অনেক বড় পাকিস্তান টিম সারাটা জীবনই এই ক্রনিক ধারাটা বহাল রেখেছে। তাদের মতো ধারাটা বাংলাদেশেরও যেন ক্রনিক না হয়ে যায়, তা নিশ্চিত করার কাজে আমাদের এখন থেকেই লেগে যেতে হবে।

পাকিস্তানি ও বাংলাদেশী ধারা দুটি একটু মিলিয়ে দেখা যাক। ২০১১ বিশ্বকাপের এক ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের রোমাঞ্চকর জয়ের পরে আরেক ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে পদদলিত পরাজয়। স্মরণ করুন ১৯৯৯ সালের প্রথম এশিয়াকাপ ক্রিকেট চ্যাম্পিয়ানশিপ সিরিজের কলকাতা ম্যাচে ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের রোমাঞ্চকর জয়ের পরের ম্যাচেই দিল্লিতে ভারতের কেবল লেগস্পিনার অনিল কুম্বলের কাছেই লজ্জাজনক হার, যিনি একাই পাকিস্তানের ১০টি উইকেট নিয়ে ইংল্যান্ডের অফস্পিনার জিম লেকারের দোসর হয়ে যেতে পারলেন। চলতি বিশ্বকাপ সিরিজে শ্রীলংকার বিরুদ্ধে পাকিস্তানের রুদ্ধশ্বাস জয় ছিনিয়ে নেবার পরের ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের কাছে ১১০ রানের বিশাল হার। তুলনীয় আয়ার্ল্যান্ডের বিরুদ্ধে সম্মানজনক জয়ের পরের ম্যাচে বাংলাদেশের মাথাকাটা-যাওয়া পরাজয় ওয়েস্টইন্ডিজের কাছে। এই ওয়েস্টইন্ডিজের বিরুদ্ধে তেমনি হার টানা ৩৪ ম্যাচ বিজয়ী অস্ট্রেলিয়াকে হারানো পাকিস্তান দলের সামনের ম্যাচেও কিন্তু অপ্রত্যাশিত কিছু নয়- ওই স্থায়ী ধারাবাহিকতাহীনতার কারণেই।

জানি আমাদের পরিচয়ের অন্যতম প্রতীক ক্রিকেটে এতসব হেনস্থার পরেও সকলের ধৈর্য ধরে রাখতে হবে। কারণ খেলায় ধারাবাহিকতা আনতে সময় লাগেই। কিন্তু পাকিস্তানি সিনড্রোমের আরেকটি লক্ষণও তাদের মতো স্থায়ী হয়ে যাচ্ছে কেন আমাদের দলের মধ্যে? সে-লক্ষণটি খেলায় নয়, খেলা সম্পর্কে বলায়। ক্রিকেট-বিশ্বের ভাষাটি ইংরেজি, যেটিতে দক্ষিণ এশিয়ার চারটি দলের মধ্যে ইন্ডিয়া আর শ্রীলংকার খেলোয়াড়গণ ক্রিকেটি বুলি ভালোই বলতে পারেন। কিন্তু সে ব্যাপারে দু-একজন ছাড়া পাকিস্তান দলের খেলোয়াড়গণ আজো পড়ে আছেন সাত দশক পেছনে। সাত দশকের হিসাবটা সেকালের পেসার আমীর এলাহীর (১৯০৮-১৯৮০) ১৯৩৬ সালের ইংল্যান্ডের খেলা থেকে হিসেব করে।

তদানীন্তন মিডিয়াম-পেসার আমীর এলাহী মনসুর আলী পাতাউদির পিতা ইফতিখার আলী পাতাউদির (১৯১০-১৯৫২) টিমে ইংল্যান্ডে খেলতে গিয়ে ভাষাগত নানারকম কেলেঙ্কারি করেছিলেন। তাই দলটির অপর সদস্য লালা অমরনাথ (১৯১১-২০০০) ক্যাপটেন হবার পরে খেলোয়াড়দের ভাষার উন্নয়ন-বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে ইন্ডিয়ান টিমের ১৯৪৭-১৯৪৮ সালে অস্ট্রেলিয়া সফরের প্রাক্কালে ট্রেনিং ক্যাম্পে ইংরেজি বলা বাধ্যতামূলক ঘোষণা করলেন তিনি। কিন্তু মানলেন না একমাত্র আমীর এলাহী, কারণ তিনি ইংরেজি জানতেন না। তবু তাঁকে দলে না নিয়ে উপায় নেই, যেহেতু ১১ বছর পূর্বের ইংল্যান্ড-সফরের মামুলি পেসারটি এখন দুর্দান্ত অফ-ব্রেক বোলার এবং দুর্ধর্ষ গুগলি স্পেশালিস্ট।

ফাইনাল ওয়ার্নিংস্বরূপ অমরনাথ বললেন- ক্যাম্পে এবং সফরকালে ইংরেজি ছাড়া কথা বললে আই শ্যাল রুইন ইয়র ফিউচার। ক্যাপটেনের লাস্ট ওয়ার্নিং শুনেই ইংরেজি বেরিয়ে এসেছিল বোলার আমীর এলাহীর : ফিউচার? হোয়াট ফিউচার? নো ফিউচার। টুয়েলভ আনা পার ডে উইথ সানডে-কাট- হোয়াট ফিউচার? নো ফিউচার। অর্থাৎ রেলওয়ের পে-রোলে তিনি দিনমজুর শ্রেণির একজন গরিব কর্মচারি, যার দৈনিক মজুরি ১২ আনা। তাও আবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন সানডের মজুরি কাটা। তার আবার ফিউচার কী? নো ফিউচার। স্মর্তব্য যে টেস্ট-ক্রিকেটারদের মধ্যে আবদুল হাফিজ কারদার আর গুল মোহাম্মদ ছাড়া একমাত্র আমীর এলাহীই নবগঠিত দুটি দেশের পক্ষেই খেলেছিলেন- ভারতের এবং পাকিস্তানের।

তার ছয় দশক পর আজও ক্রিকেট খেলা সম্পর্কে কথায় পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের ভাষার ধরন হোয়াট ফিউচার, নো ফিউচার (বর্তমান পাক-ক্যাপটেনের ইংরেজি স্মরণ করুন)। একই লক্ষণ বাংলাদেশী ক্রিকেটারদের ভাষায়, যাত্রার তিনটি দশক পরেও যাঁরা বলেন- আমার পারফর্ম ভালো ছিল না বলেই আমি বাদ পড়েছিলাম। রিটেন ইংলিশ আবশ্যকীয় নয়। কিন্তু স্পোকেন ইংলিশ কোর্স প্রয়োজনমতো না-করে নিলে যে আমরা হোয়াট ফিউচার নো ফিউচারেই থেকে যাবো। অথচ আমাদের ক্রিকেটের ফিউচার আছে।

Advertisements

যেভাবে লেখা হল আমার গোলাপ বিসংবাদ

বিচিত্র বোধ হলেও ব্যাপারটা হুবহু এমনটিই ঘটেছিল। আরামবাগের প্যাপিরাস প্রেসের কর্ণধার তরুণ সাহিত্যপ্রেমী হেলালের অকালপ্রয়াণের বছর, ১৯৮৫ সালে, তাঁর টেবিলে আমি প্রথম দেখি মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকার একেবারে প্রথম দিককার কোনো একটি কপি। বিশেষভাবে বীতশ্রদ্ধ বোধ করি নামটি দেখে। ধরেই নিয়েছিলাম যে পত্রিকাবান মীজানুর রহমান ছোকরাটা একটু বেশি ফাজিলই হবে। এমনিতেও প্রথম দর্শনে লিটলম্যাগ সাধারণত আমাকে আকর্ষণের চেয়ে বিকর্ষণই করে বেশি। দোষটা সম্ভবত আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার দৈন্যের। বেশিরভাগ ছোটকাগজকে ছোটপ্রতিভার ফসলরূপেই পেয়েছি আমি। কেউ হয়তো বড়র সাধ্যের অভাবেই ছোটতে সাধ মেটান। তবু শিল্পসাহিত্যের ভুবনে নবঅবদান যোজনের দেমাকও দেখান। পল্লবগ্রাহী পাণ্ডিত্যের আকর এসব কাগজের লেখকগণ সারবান পণ্ডিতদের প্রতি কৃপাবর্ষণের পুলকে দলেবলে মজে থাকেন। সে যাক। ইতোমধ্যে পত্রিকাটি আদ্যোপান্ত একবার উল্টিয়েই আমার মনের ভুলটা শুধরে গেল- না, এ-সম্পাদক আর যা-ই হন, অপরিপক্ক নন।

কিন্তু তাই বলে তাঁর প্রতিটি চুলই যে সুপরিপক্ক, তেমন ধারণাও আমার মনের কোনো সীমানাতেই ছিল না- আমার বাসার গেটের ওপর দিয়ে তাঁর তুষারশুভ্র মস্তকের জমজমাট পলিতকেশগুচ্ছ স্বচক্ষে দেখা পর্যন্ত। ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার দুনম্বর রোডের সরকারি বাংলোর বারান্দায় বসে এক বিকেলে আমার নয়নাভিরাম গোলাপবাগানটির উপর চোখ মেলে দিয়ে ক্লান্তিমোচন করছিলাম। ক্লান্তি ছিল দুটি খাত থেকে প্রবাহিত। প্রথমটি ছিল বছরের প্রথম সংসদ অধিবেশন অনুষ্ঠানের প্রশাসনিক ঝামেলাজনিত, আমি ছিলাম জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের যুগ্মসচিব। দ্বিতীয়টি ছিল ফুলের ভরা মৌসুমে সামগ্রিক ট্রিটমেন্টের জন্যে গোটা উদ্যানটির নিবিড় জরিপঘটিত ক্লিষ্টতাজনিত।

অনভিপ্রেত হলেও আমার প্রথম আচারণটিই ছিল জনৈক বুজর্গের প্রতি একান্ত অশোভন। উঠে গিয়ে গেট খুলে দেবার বদলে বসে থেকে গলাবাজি করলাম :

খোলা আছে, চলে আসুন।

চলে এসেই আগন্তুক বললেন :

আমি মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকার সম্পাদক মীজানুর রহমান।

শুনেই ভিরমি খেলাম। মুখোমুখি চেয়ারে বসা আমার কল্পনার ফাজিল ছোকরাটার আবক্ষমস্তক দেহখানি- কমিয়ে বললে, বিজ্ঞতার বিজ্ঞাপন; বাড়িয়ে বললে চিত্তাকর্ষক ভাস্কর্য। ভদ্রলোককে একনজর দেখেই মনে হল তাঁর চুলগুলি, প্রত্যয়ী বৃদ্ধের ভাষায়, হাওয়ার বলে পাকেনি- বিনয়ী শিষ্যের ভাষায়, চর্চার বলে পেকেছে। সে যাক। বসেই তিনি বিনা ভূমিকায় বললেন :

আমি এসেছি আমার পত্রিকাটির জন্য আপনার কাছে গোলাপ বিষয়ে একটি লেখা চাইতে।

বললাম :

এ পর্যন্ত গোলাপবিষয়টি আমি কেবল পড়ছি। অবশ্য কিছু গোলাপ হাতেও ফোটাচ্ছি। তবে লেখার স্তরে পৌঁছাতে এখনও অনেক দেরি।

হতাশ হয়ে সম্পাদক যেন নিজেকেই বললেন :

এই একটি লেখার জন্যেই আটকে আছে আমার চার শতাধিক পৃষ্ঠার বৃক্ষ-সংখ্যাটি।

বলতে বাধ্য হলাম :

তবে তো লেখাটি আপনাকে অন্য কারো কাছ থেকে নিতে হবে।

বললেন :

দুজনের কাছে চাইবো ভেবেছিলাম। কিন্তু নাম শুনে বিজ্ঞগণ বারণ করলেন এবং পাঠিয়ে দিলেন আপনার কাছে।

বললাম :

তাঁরা কেবল চোখকলমের গোলাপ ফোটানোটাই দেখেছেন আমার। বিশ্বের একনম্বর হবিপ্লান্টের উপর কলম ঘোরানোর অক্ষমতাটা আঁচ করেননি।

তবু এ-বিষয়ে আপনার একটা লেখার কোনো বিকল্পই যে জানা নেই এ মুহূর্তে আমার।

বললাম :

যদি লিখতে পারি কখনো, প্রকাশনার জন্য প্রথমে আপনার পত্রিকারই দ্বারস্থ হব। এর বেশি আমারও এ-মুহূর্তে আর কিছুই বলার নেই।

দৈহিক ক্লান্তি নিয়েই তিনি আমার গৃহে আগমন করেছিলেন, নির্গমন করলেন তার সঙ্গে মানসিক ক্লান্তিও বাড়িয়ে। বিশ্রাম নিতেই হয়তো দুটি বাড়ির পরের বাড়ি ভারতীয় হাইকমিশনের ভারত বিচিত্রার সম্পাদক কবি বেলাল চৌধুরীর রুমে ঢুকে পড়েছিলেন মীজানভাই সেদিন। ঘটনাটা অনেক পরে আমি তাঁরই জবানি জানতে পারি। আমার সঙ্গে তাঁর নেতিধর্মী অভিজ্ঞতাটার বিবরণ শুনে বেলাল চৌধুরীও পূর্বোক্ত বিজ্ঞজনদের মতোই বলেছিলেন :

একেবারে সঠিক ঠিকানায় হানা দিয়েছেন। লেগে থেকে বসিয়ে দিতে পারলে আপনার মতো হার্ড টাস্কমাস্টারকেও পুরোপুরিই পুষিয়ে দেবেন তিনি। আমার অফিস থেকে বাসায় ফেরার পথে কখনো তাঁর বাগানে থেমে কখনো বারান্দায় বসে আলাপচারিতায় গোলাপ সম্বন্ধে তাঁর নিজস্ব উপলব্ধিসঞ্জাত যেসব ব্যাপক গভীর চিন্তাভাবনার প্রসাদ পাই, তা থেকেই এ ব্যাপারে আমি একেবারেই নিশ্চিত হতে পারি।

কিন্তু তিনি নিজে তো নিশ্চিত নন।

তার কারণ তিনিও আপনার মতোই টাফ কাস্টমার, বরং আরেক কাঠি বেশি।

অতএব লেগেই থাকলেন মীজানভাই। থাকতে অসুবিধেও ছিল না কোনো। কারণ আমার ধানমন্ডি ২ নম্বর রোডের বাসাটা ছিল তাঁর সাতমসজিদ রোডের পেছনের ধানমন্ডি ৯/এ-র বাসা থেকে হাটখোলার প্রেসে আসা-যাওয়ার পথের ধারে। এ-পর্যায়ে আমার ঘরের ভেতরেও সম্পাদকের পক্ষ নিলেন একজন, আমার স্ত্রী :

এত প্রবীণ একজন সম্পাদককে এতবার না-বলা ঠিক হচ্ছে না। বসে পড়লেই লেখা এসে পড়ে- এ আমার অনেকবারই দেখা আছে।

তবু অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গেই প্রবীণ সম্পাদককে শেষবারের মতো বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম যে, আমি সাহিত্যশিল্পী নই, সাহিত্যশ্রমিক। আরো জানিয়েছিলাম যে, আমার এ মাসের পুরো শ্রমটাই বুক হয়ে আছে জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সার্বক্ষণিক কাজে, যেখানে এ মুহূর্তে সংসদের শীতকালীন অধিবেশন চলমান এবং আমি তার সাচিবিক দায়িত্বের পিভটাল অফিসার।

সম্পাদক বললেন :

সাবর্ক্ষণিক কাজে ফুরিয়ে যাওয়া অফিসারটির নিজেকে পুনরুজ্জীবিত করার সাময়িক বিরতিগুলিতে অফিসে বসেই না-হয় একটু একটু করে লিখবেন।

তাঁর প্রস্তাবটা শুনে পত্নীর পরামর্শটাও মনে পড়ল।

বললাম :

একটু একটু করে নেবেন লেখাটা?

সানন্দে।

তাহলে পরশু আসুন।

এলেন। তিনটি স্লিপ দিয়ে বললাম :

পরশু আসুন।

এলেন এবং আরো তিনটি স্লিপ পেলেন। এমনি আরো দু কিস্তি নেবার পরের তারিখে এসে মীজানভাই বললেন :

এভাবে আর নেব না। একবার এসে সবটুকু একসঙ্গে নিয়ে যাব।

আঁৎকে উঠে জানতে চাইলাম :

কবে?

যবে লেখাটা শেষ হবে।

কতটুকু হলে চলবে?

যেভাবে লিখছেন, এভাবে লেখাটা যতটুকু গিয়ে শেষ হয়।

বিভ্রান্ত হয়ে বললাম :

মানে?

মানে আপনার কলম যেখানে গিয়ে থামে। জানালেই এসে বাকি লেখাটা আমি একসঙ্গে নিয়ে যাব।

বিব্রত হয়ে বললাম :

মীজানসাহেব! আন্তরিকতা সত্ত্বেও এর চেয়ে তাড়াতাড়ি কিছু লিখে দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না।

না, না, শাকুরসাহেব, আমাকে ভুল বুঝবেন না। এ-রচনা যত দীর্ঘ হতে চায়, হোক। যত সময় নিতে চায়, নিক। আমি স্টপ প্রেস করে ওদের মেশিনে অন্য ম্যাটার তোলার অনুমতি দিয়ে দিয়েছি।

অভিভূত হয়ে আমি শুধু বলে উঠলাম :

কিন্তু বিশাল বৃক্ষ-সংখ্যাটির বিজ্ঞাপন?

মীজানভাই বললেন :

বড় বিজ্ঞাপন কিছু হারাব। ত্রৈমাসিকটির দুটি সংখ্যাও যুক্ত হয়ে একটি হয়ে যাবে। তবু সবই পুষিয়ে যাবে এ-লেখাটা পরিপূর্ণরূপে ছাপতে পারলে।

শুনে আমি বাক্যহারা হয়ে কেবলি ভাবছিলাম- তাহলে এ যুগেও এমন রসপwÐত একজন সম্পাদক আছেন যিনি এমন সমঝদার একটি পত্রিকার কাছে আপসহীনভাবে দায়বদ্ধ থাকেন। শ্রদ্ধাভরে বিনীতভাবে আমি কেবল জানতে চাইলাম :

লেখাটা কি এতই ভালো লাগছে আপনার?

শুধু আমার নয়, রচনাটা অসাধারণ বোধ হচ্ছে আমার পত্রিকার মুদ্রক, লেটারপ্রেসটির মালিক, সুপাঠক তরুণকুমার মহলানবিশেরও (যিনি পরবর্তীকালে প্রুফরিডার হিসেবে খ্যাতির শীর্ষে আরোহণ করেছেন)।

সে যাক। মীজানভাই পরিপূর্ণরূপেই ছেপেছিলেন তাঁর পত্রিকার ক্ষুদ্র হরফে আমার ৫৫ পৃষ্ঠা দীর্ঘ লেখাটা- রঙিন একটি আলাদা অনুপ্রচ্ছদ দিয়ে। যাতে কেউ চাইলে, রচনাটা প্রচ্ছদটিসহ বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে সুন্দরভাবে সংরক্ষণ করতে পারে। সম্পাদক প্রচ্ছদটির বিপরীত পৃষ্ঠায়, অর্থাৎ আখ্যানপত্রে, সোয়েডিশ বটানিস্ট কার্ল ভন লিনিয়াসের চমৎকার একটি ছবিও জুড়ে দিয়েছিলেন, যিনি জিনাস এবং স্পিশিস-এর ল্যাটিন নাম দিয়ে উদ্ভিদের শ্রেণী নির্দিষ্টকরণ প্রথাটির জনক। এই হল মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকার অক্টোবর ১৯৮৬/ডিসেম্বর ৮৬ বৃক্ষ সংখ্যাটির জানুয়ারি ১৯৮৭/মার্চ ১৯৮৭ সংখ্যাটির সঙ্গে জুড়ে গিয়ে যুগ্মসংখ্যা হয়ে বেরুবার নেপথ্যকাহিনী।

গোলাপ বিসংবাদ-নামক আমার সে-রচনাটির অর্জিত অনেক খ্যাতির কথাই মীজানভাই তাঁর ব্যক্তিগত আনন্দের ভাগ দেবার খেয়ালে সময় সময় আমাকেও বলতেন। যেমন মস্কোবাসী নিসর্গকৃষ্ণ দ্বিজেন শর্মার লিখিতপত্রজনিত আনন্দ এবং কলকাতার প্রতিক্ষণ পত্রিকার প্রতিবেদনপ্রদত্ত আনন্দ। লেখাটিকে ভিত্তি করে প্রকাশিত আমার গোলাপসংগ্রহ ১৪১০ সনের বর্ষসেরা মননশীল গ্রন্থ হিসেবে প্রথম আলো কর্তৃক পুরস্কৃত হলে সবচেয়ে বেশি খুশি হন মীজানভাই এবং সঙ্গত কারণেই। বইটির উৎসর্গও আমি তাঁকেই করেছি এবং উৎসর্গপত্রে তাঁর সম্পর্কে কেবল সত্য কথাটাই লিখেছি : যিনি এই গোলপলালককে গোলাপলেখক বানিয়েছেন। উৎসর্গপত্রটি পড়ে মীজানভাই বলেছিলেন :

আমার ভাগ্যে উৎসর্গিত বই অনেকই জুটেছে। তবে এটি অমূল্য।

আর দ্বিজেনদা বলেছিলেন :

তোমার গোলাপসংগ্রহ মীজানকে উৎসর্গ করে তার চেয়ে বেশি খুশি করেছ তুমি আমাকে।

গোলে নয় রানেই হারালাম

ক্রিকেটেও নাকি গোলেই হারাতো ইস্টপাকিস্তান। বাংলাদেশ তো রানেই হারালো আয়ার্ল্যান্ডকে- তাও দু-এক রানে নয়, দু-দশের উপরে আরো সাতটি রানে। ঘটনাটা পরে বলবো। প্রথম কথা গরিবের খেলা ফুটবল ছেড়ে ধনীদের খেলা ক্রিকেটটাকেই কেন চেপে ধরলো অতি দরিদ্র বাংলাদেশ? তর্কই বেধে গেল। একপক্ষে ফুটবলপ্রেমী তুমি, আরেকপক্ষে ক্রিকেটপ্রেমী আমি। তুমি বললে :

ক্রিকেট অলস লোকদের এমন এক অলস খেলা, যে-খেলায় ২২ জনের দুটি টিমের ৯ জনকে মাঠের বাইরে বসে থাকতে হয় বাধ্যতামূলকভাবে। মাঠের ভেতরের অনেক খেলোয়াড়কেও কাজের অভাবে দাঁড়িয়ে-বসে হাই তুলতে হয়। তবে হাই তোলার বদলে গ্যালারির লোকজনের সঙ্গে গল্পগুজব করে সময় কাটাতে পারেন কেবল লাইনে দাঁড়ানো ফিল্ডারগণই। এ কারণেই উপমহাদেশে ভ্রমণ করতে এসে বন্ধুর অনুরোধে ক্রিকেট খেলা দেখে দেশে ফিরে জনৈক মার্কিন ট্যুরিস্ট এরকম মজার বর্ণনা দিতে পারেন :

“ইন্ডিয়ার বিরাট একটা স্টেডিয়ামে গিয়ে দেখলাম, মাঠের মধ্যখানে এক বেকার হাঁটু ভেঙে দাঁড়িয়ে মাটিতে অনবরত একটা খুঁটি ঠুকে যাচ্ছে। তার পেছনে উঁকি মেরে বসে আছে আরেক বেকার। মুখোমুখি কিছু দূরে তৃতীয় বেকার তেমনি একটি খুঁটিতে ভর দিয়ে স্রেফ দাঁড়িয়ে আছে, আর ১০ জন লোক সারা মাঠে এদিক ওদিক হেঁটে বেড়াচ্ছে গরুর মতো। সঙ্গীকে জিজ্ঞেস করলাম ১৩ জন শক্তসমর্থ জোয়ান চমৎকার একটা খেলার মাঠে এমন আচরণ করছে কেন? সে বললো- ওরা ক্রিকেট খেলছে। এমন পাগলা খেলা আমি আমেরিকায় দেখিনি। ইউরোপেরও কেবল ইংল্যান্ডেই থাকতে পারে। কারণ ইংরেজরাই নাকি এই পাগলামি ইস্টইন্ডিয়া আর ওয়েস্ট ইন্ডিয়াকে শিখিয়েছে।

তুলনায় ফুটবল খেলায় প্রতিটি মুহূর্ত ২২ জনের দুটি টিমের প্রতিটি খেলোয়াড় একই সঙ্গে ঊর্ধ্বশ্বাস এবং রুদ্ধশ্বাস কর্মতৎপর অণুর মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে সমগ্র ময়দানময়। হীরার টুকরার মতো দ্যুতি ছড়ানো এ-খেলার কোটি কোটি দর্শকের শ্বাসরুদ্ধকর অ্যাকশান-প্যাক্ড দেড় থেকে দুটি ঘণ্টা সময় যেন দৃষ্টিনন্দন এক গীতিকাব্য। যে-কারণে বর্তমান বিশ্বে ফুটবলফ্যানের সংখ্যা ৩.৫ বিলিয়ন। এরা ছড়িয়ে আছে পৃথিবীর প্রতিটি মহাদেশ জুড়ে। ক্রিকেটফ্যানের সংখ্যা মাত্র ২ থেকে আড়াই বিলিয়ন। কারণ এদের দেখা মেলে কেবল যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ওয়েস্টইন্ডিজ আর এই উপমহাদেশে।

শোনা যায়, খেলার রাজা ক্রিকেট। কথাটা ভুল। বরং বলা যায়, রাজার খেলা ক্রিকেট। কারণ খেলাটা এদেশে এনেছেন ইংরেজ রাজারাই। এদেশি রাজারা খেলাটাকে এখনো রাজাদের খেলা করেই রেখেছেন- অর্থাৎ গরিবের দেশে ধনীদের খেলা। অথচ সমগ্র বিশ্ব জুড়েই আমজনতার পরানপ্রিয় খেলা হিসেবে সত্যকার খেলার রাজা হল সহজ সরল সুলভ সুন্দর ফুটবল। গণমানুষের খেলা ফুটবল গোলের খেলা। এজন্য লোকে জেতাকে গোল দেওয়া বলে, উইকেট পাওয়া বলে না। আর হারাকেও রান খাওয়া বলে না, গোল খাওয়া বলে।

আমি বললাম :

তোমার এ কথাটা ঠিক যে লোকে জেতাকে “গোল দেওয়া বলে। আমাদের ছাত্রজীবনে শুজাউদ্দিন নামে পাকিস্তানের সাধারণ এক স্পিন-বোলার অসাধারণ স্পোর্ট-রিপোর্টার ছিলেন উর্দু পত্রিকার। উচ্চবিত্ত পাড়ায় ক্রিকেটের ফ্যাশন এবং সে বিষয়ে নারীমহলের আদিখ্যেতা সেকালেও ছিল। ঢাকায় পাঁচদিনব্যাপী পাক-ভারত ক্রিকেট-টেস্টের রেস্ট-ডে-তে জনৈক ধানমন্ডিবাসী ক্রিকেটফ্যানের প্রাসাদোপম হাবেলিতে পাকিস্তান-টিম ডিনারে আপ্যায়িত হচ্ছিল। সখ করে স্বহস্তে পরিবেশনের সময় লেডি-কিলার ফজল মাহমুদকে তাঁরই ক্লিন-বোল্ড গিন্নি জিজ্ঞেস করেছিলেন- আপনাদের আপ্যায়নের আয়োজনে ব্যস্ত থাকাতে আমি স্টেডিয়ামে যেতে পারিনি, কাল ইন্ডিয়াকে আপনারা কত গোলে হারালেন? শুজাউদ্দিনের ভাষায় বেস্ট-বডি-অফ ঢাকার প্রশ্নটি ছিল তাঁর পাতের দারুণ দুটি কাবাব মে নিদারুণ একটি হাড্ডি। এই ক্রিকেট-মূর্খতার সূত্রে প্রকাশিত বাঁটুল স্পিনারটির বিষাক্ত বাঙালি-বিদ্বেষপূর্ণ রিপোর্টটি আমি পড়েছিলাম করাচির সর্বজনপ্রিয় উর্দু দৈনিক জং পত্রিকায়।

পাকিস্তানিদের তীব্র সেই বাঙালি-বিদ্বেষের কারণে পূর্ববাংলার উদীয়মান কোনো প্রতিশ্রুতিশীল ক্রিকেটান্তপ্রাণ খেলোয়াড়কেও সুযোগ দিয়ে গড়ে তুলতেন না পাকিস্তানের কোনো ক্রিকেট-অভিভাবক। ফলে অনেক বাঙালি প্রতিভাই অকালে ঝরে পড়তো। তেমনি একজন মইনুলকে আমার মতো অনেক প্রবীণেরই এ-মুহূর্তে মনে পড়বে। সেই পূর্বপাকিস্তানই বাংলাদেশ হয়ে ২০১১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি আয়ার্ল্যান্ডকে, ২৭টি গোলে নয়, ২৭টি রানেই হারালো। হারালো বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ ক্রিকেটেরই প্রতিযোগিতায়!

আজ বাংলাদেশের হাজারো গৃহিণী-তরুণী শুজাউদ্দিনদের বলে দিতে পারবে ইতিহাসসহ- বুমবুম আফ্রিদিদের মতো কামান-দাগিয়ে ব্যাটসম্যানদের নাকের ডগায় তোপের মুখে ফিল্ডিঙের “সিলি মিড-অন” “সিলি মিড-অফ” পজিশনগুলির সৃষ্টি হয়েছিল কেন এবং কীভাবে। এই সিলি-শব্দটি কিন্তু পঞ্চদশ শতকের অরক্ষিত-অসহায় অর্থে ব্যবহৃত নয়, ষোড়শ শতকের শেক্সপিয়ারের টিমন অফ এথেন্স-এ ব্যবহৃত আজকের “রিডিকিউলাস” কিংবা হাস্যাস্পদ বা অযৌক্তিক অর্থেই। ১৯৬৬ সালে ওয়েস্টইন্ডিজের কাছে হোয়াইট-ওয়াশ এড়াতে শেষ টেস্টে ইংল্যান্ডের নেতৃত্বে ডেকে আনা ব্রায়ান ক্লোজকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল- বোলারদের ঘাতক গারফিল্ড সোবার্সকে কীভাবে ঠেকাবেন? ক্লোজ বললেন- আমিই দাঁড়াবো নেক্সট টু হিম, আত্মঘাতী সিলি-মিডঅফ পজিশানে। রেজাল্ট হয়েছিল : সোবার্স, কট ক্লোজ, বোল্ড স্নো, শূন্য।

প্রতিপক্ষকে নির্মম চাবুক মারা সোবার্স স্মরণ করালো বাংলাদেশের এক সাবেক ক্যাপ্টেনকে, যিনি আয়ার্ল্যান্ডকে হারানোর পরদিন বলেছিলেন : আগে বাংলাদেশ কেবল চাবুকের মার খেত, পরে চাবুক ধরা শিখলো; এখন নিজেই চাবুক মারতে শুরু করেছে। আমি বলছি, এখন থেকে বাংলাদেশ চাবুক কেবল মারতেই থাকবে, কেবল মারতেই থাকবে।

 

আবদুশ শাকুর

নথির গতি(আবদুশ শাকুর)

সামনের মহলের মজিদসাহেব খবরটা পড়ে কাগজ হাতেই চলে এসেছিলেন আমার ফ্ল্যাটে–মামলাবদ্ধতায় আটকা পড়ে আছে সরকারের অজস্র অর্থ, তার মধ্যে এক রাজস্ব বোর্ডের পাওনাই হাজার-হাজার কোটি টঙ্কা। তাঁর প্রশ্ন :

এরকম হলে সরকার চলবে কী করে?

আমার প্রশ্ন :

সরকার চলতে চায় নাকি?’

মানে?

আমার ধারণা আমাদের কালের মতো একালের সরকারও চলতে চায় না। চাইলে হালের সরকারি অফিস-আদালতও সেকালের মতো স্থবির হয়ে পড়তো না। আর অগণন জনগণের জীবনও সরকারের নথির কবলে আটকা পড়ে থাকতো  না।

‘আটকা পড়ার কারণ?’

‘সিদ্ধান্তহীনতা।’

‘সিদ্ধান্তহীনতা কেন?’

‘সকল উপরওয়ালাই পাখিটা শিকার করতে চায় তাঁর নিচেওয়ালার ঘাড়ে বন্দুকটা রেখে।’

‘কেন?’

‘সরকারেরই স্বভাবদোষে।’

‘দোষটা কী?’

‘যে-ব্যক্তি কাজ করে এবং সিদ্ধান্ত দেয় সরকারবাহাদুর তাকে তিরস্কার করেন। আর পুরস্কারটা দেন যে-অফিসার কাজ না-করে দলের সঙ্গে ভাব করে তাকে। এবং সরকারের কাছে এই অকেজোদের চাহিদাই সবচেয়ে বেশি, বিশেষত গুরুত্বপূর্ণ পদগুলি পূরণের ক্ষেত্রে। কারণ সরকার হুঁ করতেই এরা হাঁ করে।’

‘যেমন?’

‘যেমন আমি এমন কয়েকজন নন-ওয়ার্কার অফিসারের সঙ্গে চাকরি করেছি, ধরুন তাঁদেরই একজন সংস্থাপন-সচিব নিয়োজিত হলেন। তিনি দিবাশেষে অফিস ছাড়ার মুখে উপর থেকে-আসা মেইলটি পেয়ে না-পড়েই “প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিন” লিখে চট্টগ্রাম চলে গেলেন সরকারি সফরে। পরদিন বিমানবন্দর থেকে সোজা অফিসে ঢুকেই শুনলেন যে তাঁকে বাধ্যতামূলক অবসর দেয়া হয়েছে। শুনে তিনি বললেন :

‘আদেশটি দেখি।’

‘আদেশ তো স্যার রাত্রেই বাসায় পাঠিয়ে দিয়েছি।’

‘ফাইল-কপি আনুন।’

পি.এ বেরুতেই বাসায় ফোন করলে ছোটো ছেলেটি বললো :

‘খামটা আমার টেবিলেই আছে, মাকে বলতে ভুলেছি। খুলে পড়বো?’

বেহুঁশ সচিব হুট করে বলে বসলেন :

‘পড়ো।’

‘যেহেতু আপনি কর্মদক্ষতা সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলেছেন…যেহেতু আপনি পুরোপুরি অকর্মণ্য হয়ে পড়েছেন…’

ফোনটা রেখে দিলেন সম্বিৎ-ফেরা সচিব।

শুনে মজিদসাহেব বললেন :

‘এর মানে এঁরা নিজে কোনো সিদ্ধান্ত তো দেনই না, অন্যের কোনো সিদ্ধান্তও খতিয়ে দেখেন না। তবে, টু গিভ দ্য ডেভিল হিজ ডিউ, বলতেই হয় যে এঁরা অন্তত নথির গতিটা বাড়ান।’

‘হাঁ, এঁরা গতি বাড়ান বেঠিক সিদ্ধান্তের নথির। সঠিক সিদ্ধান্তের নথির গতি আটকানও এঁরাই, আশঙ্কিত তিরস্কারের ভয়ে।’

‘সরকারের একজন সাবেক সচিব হিসেবে ছুটির এই সুন্দর সকালে আমাকে আপনি একটু বুঝিয়ে বলুন দেখি–নথি এঁরা আটকান কীভাবে?’

‘একটি নথির নজিরই দিচ্ছি, যেটির গতি বাড়াতে আমি হাতে করেই নিয়ে গিয়েছিলাম জনৈক উদ্যাপিত সচিবের রুমে। পরের ঘটনাটুকু শুনুন ডাইরেক্ট ন্যারেশনে।’

‘এ-ফাইলটা একটু দেখতে হবে স্যার–’

‘আরে রাখ, রাখ। তুমি দেখেছ তো? কিংবা তোমার তুমি?’

‘আমরা তো স্যার ভালো করেই দেখেছি। তবে–’

‘দেখলে আবার তবে কী? তোমার এত বড় একটা নোটের কোথাও ছোট্ট একটা প্রস্তাবের আভাস-ইঙ্গিত থাকলেই তো আমার ক্ষুদ্র ইনিশ্যালটুকু অর্থপূর্ণ হয়ে যাবে–মানে, প্রস্তাবমতে ব্যবস্থা নিন।’

‘প্রস্তাব তো স্যার একেবারে গোড়ার নোটেই আছে সেকশন-অফিসারের। সেকশন-অ্যাসিস্ট্যান্ট থেকেই ইন-চার্জ হয়েছে তো–বেশ অভিজ্ঞ নোটসহই পুটাপ করেছে। আমি ভাবগুলিকে শুধু একটু সম্প্রসারণ করে দিয়েছি–তবে সেকশনের প্রস্তাবানুযায়ীই–’

‘প্রস্তাবানুযায়ী? তাহলে আর কথা কী? তোমার যথাপ্রস্তাব তো হয়েই আছে। আমার যথাপ্রস্তাবটা যোগ হলে তো একেবারে যথাযথই হয়ে যাবে। দাও দেখি, একটা গোটা সিগনেচারই করে ফেলি। কতদিন যে করা হয়নি–কত শখ করে মকশ করা ক্যালিগ্রাফি! তখন কি আর জানতাম যে সারাজীবনের লেখাপড়ার মোট গরজটা কর্মজীবনে অস্পষ্ট একটি ইনিশ্যালে এসে ঠেকবে–’

‘স্যার, কেসটা খুবই সেন্সিটিভ। সইটা একটুখানি পড়ে-দেখে না-করলে–’

‘সেন্সিটিভ! তুমি-না বললে নোটে প্রস্তাব আছে? আরে মিয়া, স্পর্শকাতর নথি কোনো প্রস্তাবের ভার সইতে পারে নাকি? না, না, না–মতামত-কণ্টকিত কোনো নাজুক নথিতে তো আমি নাক গলাবো না। ফেরত নিয়ে যাও। এটা-নয় তবে সেটাও-নয় অথবা এটাও-আবার-সেটাও–এধারার একটা পেশাদার টোকা সহকারেই পেশ করবে।’

‘তাহলে স্যার আপনিই যদি একটুখানি গাইডেন্স দিয়ে দিতেন–’

‘এই নৈমিত্তিক ব্যাপারেও গাইডেন্স? শোন। প্রথম প্যারাটায় যা খুশি একটা কিছু লিখে, দ্বিতীয় প্যারার শুরুতেই বলবে : এর অর্থ এই নয় যে আমি শুধু এ-ই বলতে চাচ্ছি। তারপর একদম উল্টা কথায় দ্বিতীয় প্যারাটি শেষ করে তৃতীয় প্যারার শুরুতেই লিখবে : তাই বলে যে এর উল্টোটা একেবারে নাকচ করতে বলছি, তাও কিন্তু নয়। অতঃপর “অন্যকথায়, আমি বলছিলাম”-বলে ওই পয়লা প্যারাটাকেই ভিন্ন ভাষায় রিপিট করে তৃতীয় প্যারাটি ভরাট করে দেবে। ব্যস, সার্কিট কমপ্লিট–মানে কেল্লা ফতে। এর পরে এভাবে প্যারায়-প্যারায় যত পাতাই ভরাট করার দরকার হয় বা ফরমাশ হয়–আর কোনো সমস্যাই হবার কথা নয়।’

‘চমৎকার একটা কায়দা তো স্যার! আমার ধারণা ছিল এটা শুধু প্রবন্ধ-নিবন্ধের বা সমালোচনা-সাহিত্যেরই হালের  একটি রচনাশৈলী। এটা যে সনাতন নথিপত্রেও একই রকম প্রাণ বাঁচানোর সঙ্গিন দায়িত্ব পালন করে, তা তো জানতাম না। কিন্তু স্যার, এই নথিটা যে অতি আর্জেন্টও–’

‘আর্জেন্ট? অ্যাঁ? আমার চাকরিটাই খেতে চাও নাকি? আরে মিয়া মানুষ চলে নিজের কোমরের জোরে আর সরকার চলে মন্ত্রকের কোমরের জোরে। মানে মিডলেভেল অফিসারের জোরে, মানে তোমাদের বিদ্যার জোরে। উপসচিবও যদি অসহযোগিতা শুরু করে–। দাও নথিখানি। তোমার ওই দুষ্কৃত টোকাটাকে ছোট্ট একটা ঠোকা মেরে সংস্কৃত করে দিই–“কথা বলুন”।’

‘কিন্তু স্যার এটা-যে “অতি জরুরি”-পতাকাবাহী নথি!’

‘আহ! সেজন্যেই তো কালই আবার পুটাপ করবে। এবং এখান থেকে ফরমান যাবে “আলোচনা করুন”।’

‘তারপর স্যার?’

‘পরের দিন আবার সাবমিট করবে। এবং নির্দেশ পাবে “আলোচনানুসারে”।’

‘তারও কি পর আছে স্যার?’

‘অবশ্যই আছে। পর মানে বিলম্ব তো? বিলম্বে প্রয়োজন থাকলে নথির বিলম্বকে জীবন থেকে জীবনে, মরণ থেকে মরণে, জেনারেশন থেকে জেনারেশনে, কাল থেকে কালে–মানে একেবারে অনন্তকালের রথেই চড়িয়ে দিতে পার। তবে কয়েকটা বছরমাত্র ধরে-রেখে যদি তোমার নিজের ট্রান্সফারটা শুধু পার করে দিতে চাও, সেক্ষেত্রে কেবল একটি সিরিজই যথেষ্ট–’

‘এটাই বেশি দরকার স্যার।’

‘বেশ। প্রথমে হবে “প্রাসঙ্গিক রুল-রেগুলেশনসহ পেশ করুন”।’

‘তারপর স্যার?’

‘আইন মন্ত্রণালয়ের মতামতসহ পেশ করুন।’

‘তারপর?’

‘তারপর তাসের ওই নোট্রাম্পের সিরিজ আরকি। চাইলে সবকটি অতিমন্ত্রকই ঘুরিয়ে আনতে পার–যেগুলি সুপ্রা-মিনিস্ট্রি, সার্ভিসিং-মিনিস্ট্রি ইত্যাদি নামে জনপ্রিয়। কারণ তারা অন্য মিনিস্ট্রিকেও সার্ভ করার জন্যে মোতায়েন। এই যেমন ফাইনান্স মিনিস্ট্রি, হোম মিনিস্ট্রি, সংস্থাপন মন্ত্রক, পররাষ্ট্র মন্ত্রক প্রভৃতি।’

‘কিন্তু এ-তো একনিঃশ্বাসেই শেষ হয়ে এল স্যার। এদিকে আমি যে-ডিভিশনে আছি, সেখান থেকে বদলি তো দশবছরেও হবে না। কেউ-যে আসতেই চায় না এখানে। সরকারি অফিসে বদলিটা তো কেবল পরের গরজেই হয়।’

‘ঘাবড়ানোর কিছু নাই, মিনিস্ট্রির পরে বোর্ড আছে : রাজস্ব বোর্ডের মতামতসহ পেশ করুন।’

‘সে তো শুধু স্পেশাল কেসে স্যার–’

‘আরে বাবা, তাবত কেসেই পাবে যেমন : পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মতামতসহ পেশ করুন। তাছাড়া রয়েছে গভর্নমেন্ট প্লিডারের মত, পাবলিক প্রসিকিউটারের মত। তদুপরি তদ্দিনে তো নির্ঘাত একটা রঙের টেক্কাই পেয়ে যাবে, মানে বিবেচ্য বিষয়টির ওপর মামলাই হয়ে যাবে। আর তখন তো তুমি অন্তিম স্বস্তির সঙ্গেই লিখবে–বিষয়টি মহামান্য আদালতে বিচারাধীন বিধায় আপাতত আমাদের কোনো বিবেচনার অবকাশ নেই। ব্যস।’

‘মানে কেল্লা ফতে?’

‘সে তো বটেই। এই অন্তিম পঙ্-ক্তিটি রচনার পর নথিখানিতে তোমার আমলামির আয়ুষ্কালে আর কিছু লেখার দরকার হবে না। তবে প্রয়োজন হবে ফি-বছর ডিডিটি-পাউডার মাখানোর। পাছে না-বুঝেসুজে নথিটি উই-ইঁদুরে-না    ডিসপোজফ্ করে ফেলে। কোর্টকাছারি-ঘটিত নথিপত্রের রেকর্ড ধ্বংস করার এক্তিয়ার যেখানে জবর অফিসারেরই নেই, সেখানে ইতর জানোয়ারের থাকার তো প্রশ্নই ওঠে না।’

‘তা তো বটেই। কিন্তু স্যার, আপাতত আমার হাতে-ধরা এই পবিত্র নথিটির কী বিহিত হবে? এ যে টপ-প্রায়রিটি-চিহ্নিত?’

‘আহা, এই টপ-প্রায়রিটির উত্তাপেই তো নথিটি কোথাও একদিনের বেশি দুদিন টিকতে পারছে না–না কোনো ঘরে, না কোনো টেবিলে। কেবল এ-ঘর থেকে ও-ঘর মাকুর মতো মাথা খুঁড়ে মরছে। মানে ফাইলটি ননস্টপ মুভ করছে এবং অবিশ্রান্ত ছুটে চলেছে তার কক্ষপথে।’

‘সে পথ তো অসীমের। কিন্তু এই সসীম নথিটির কী গতি হবে স্যার?’

‘নথির গতি? সে তো অতি সদ্-গতিই হবে হে। নথিটির হ্রস্বযতিঋদ্ধ গতির ‘ছন্দে ছন্দে দুলি আনন্দে’ তোমরা আনকোরা একটা “অধরা” নোট তৈরি করে নেবে, যার মতিগতি হবে সকল-দিক অথচ না-এদিক-না-সেদিক। অর্থাৎ কিনা সমগ্র টোকাখানির শব্দাবলি এমনি ব্যালেন্স্-ড হবে যে, বিবেচ্য বিষয়টির সপক্ষে কি বিপক্ষে–মত অথবা অমত কার যে ঠিক কতটুকু তা বোঝার কোনো উপায়ই থাকবে না।’

‘এ যে মাথা-ঘোরানো ব্যালেন্সের খেলা স্যার।’

‘ব্যাল্যান্সের খেলার নাম সার্কাসে একাধিক থাকলেও, সরকারে ওটার একটাই নাম–ফাইল-ডিসপোজাল। তবে এই সরকারি খেলাটির সার্কাসি নামটি হল গিয়ে–টাইট-রোপ-ওয়াকিং।’

‘তাহলে যে অপার মুশকিলেরই ব্যাপার স্যার! রশির ওপর তো, সার্কাসে দেখেছি, নাবালিকাও হরষেই হাঁটে। কিন্তু এরকম ব্যালেন্স রেখে ফাইল পুটাপ করা তো আমার মতো সাবালকের পক্ষেও সম্ভব বলে মনে হচ্ছে না। প্যারায়-প্যারায় যত প্যাঁচই কষি না কেন, শেষের গিঁটটার–’

‘শেষের গিঁট আবার কিসের? নথিবন্দী কেসমাত্রই তো অশেষ। সবর্জ্ঞ কবি তাঁর অমর গানটিতে নথির গাথাও তো  গেয়েছেন–“আমারে তুমি অশেষ করেছ, এমনি লীলা তব–/ফুরায়ে ফেলে আবার ভরেছ, জীবন নব নব/”। জান তো–বিবেচ্য বিষয়ের বিহিত-বিনা ফাইলের পৃষ্ঠাসংখ্যা দুই শ পার হলেই নতুন নথি খুলতে হয় এবং তখন মূল নথিটি হয়ে যায় সংযুক্ত নথি।’

‘আমি এখন চলি শাকুরভাই–মাথাটা কেমন যেন ঘুরছে।’

মজিদসাহেবের মতো একজন সদিচ্ছুক নাগরিকের এই মাথাঘোরা কে বন্ধ করবে? এবং কবে?

রচনাকাল ২০০৯

‘করতে হবে’

আমার দূরসম্পর্কের কাজিন আলমভাই পঁচিশ বছর আগে আইএ পাশ করে অনেককিছুই গভীরভাবে ভেবেছেন অনেককাল এবং অস্থিরভাবে করেছেন কিছুকাল। কিন্তু উদ্যোগের অভাব আর আলস্যের প্রভাবে–হয়নি কিছুই বরং গিয়েছে সবই। আছে কেবল পিতৃদত্ত নাম আর পত্নীদত্ত বদনাম। তবে তাঁর সব ব্যর্থতার লাগসই জবাব আছে। যেমন মাস্টারি করতে পারলেন না, কারণ মাস্টারে আর ডাস্টারে তফাৎ নেই। তেমনি ঠিকাদারি হল না, কারণ ঠিকাদারি মানেই চুরিচামারি। দোকানদারি হল না, কারণ ওটা বাকিবকেয়ার ঝকমারি। ব্রোকারি হল না, কারণ ওটা দালালি; যা খোলাখুলি একটি গালি।

তবে আলমভাইকে যত নিষ্কর্মা মনে হয়, আসলে তত নিষ্কর্মা তিনি নন। করিতকর্মা না হলেও, ‘করিবকর্মা’ তাঁকে বলতেই হবে। কেননা কর্মটা তিনি বরাবরই করেন–তবে বর্তমানকালে নয়, ভবিষ্যৎকালে। বর্তমানে কেবল ভবিষ্যতকর্মের ছক কাটেন, আর অতীতকর্মের ত্রুটি ঘাঁটেন। ফলে, তখন অমন করলে এখন এমন হত আর এখন এমন করলে তখন অমন হবে–এবংবিধ বচনই শুধু শ্রুত হয় তাঁর শ্রীমুখ থেকে। এককথায়, কর্তব্য সম্পর্কে সদা-সচেতন এবং সম্পাদন সম্বন্ধে আপাত-অচেতন আলমভাই আমাদের বহু বিশেষণেই বিশ্রুত ছিলেন–অতীতের নাগরিক, বর্তমানের দার্শনিক, ভবিষ্যতের স্বাপ্নিক ইত্যাদি। এবারে অনেক বছর পরে এলেন বলে জানতে চাইলাম :

‘শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামলেন আলমভাই?’

‘জীবনে অনেক কিছুই তো করতে চাইলাম হে। শেষ পর্যন্ত ভাবলাম চাকরিটাই আমার জন্যে ঠিক।’

‘একেই বলে মানুষের মন! এত গবেষণাশেষে কর্মজীবনটি শুরু করলেন–তাও সেই চাকরি দিয়ে? মানে আপনার কৃপার বস্তুটি দিয়ে? তা চাকরিতে মন বসল কত দিন হল?’

‘তিন বছর।’

‘চাকরিটি কী?’

‘ভাবতে হবে।’

‘কাজটা কোথায়?’

‘দেখতে হবে।’

চিরপরিচিত সেই ‘অসমাপিকা ক্রিয়াপদ’টি দুই-দুইবার শুনতে পেয়ে সভয়ে জানতে চাইলাম :

‘কিছু মনে করবেন না আলমভাই, চাকরিতে আপনি যোগ দিয়েছেন তো?’

‘আর কীইবা করার আছে এ-দেশে বল? চাকরিতেই তো যোগ–দিতে হবে।’

‘দিতে হবে! তার মানে খোঁজ পেয়েই ছুটে এসেছেন যোগ দিতে?’

‘চাকরির খোঁজ কি কেউ কাউকে দেয় ভাই! খোঁজখবরও নিজেকেই–নিতে হবে।’

‘নিতে হবে! তা ঘরের কাছের চাটগাঁয়ও কোন কিছুর খোঁজ পেলেন না? ক্ষমতাসীন দলের একজন নির্মোহ কর্মী হয়েও সামান্য একটা চাকরির খোঁজে আপনাকে ঢাকা পর্যন্ত ছুটে আসতে হল?’

‘ছুটে আসা ছাড়া উপায় কি বল? ছোটাছুটি ছাড়া কোন্ কাজটাইবা সম্ভব। এখানে ছুটে এলাম, না হলে চট্টগ্রামে ছুটব। এবং সেখানেও না-হলে তো খুলনা-পাবনাও–ছুটতে হবে।’

‘ছুটতে হবে! এবং ছোটাছুটিরও এখান থেকেই শুরু। অযথা ছোটার আগে, ছুটে গিয়ে যে-শক্তিধরদের ধরতে হবে তাঁদের ধরার ব্যবস্থা করেছেন?’

আলমভাই যেন এই প্রথম একটু আহত হয়েই কথা বললেন :

‘ও, মামা ধরার কথাটাও শিখিয়ে দিচ্ছ? আরে ভাই, সর্বপ্রথমে তো মামাই–ধরতে হবে।’

‘ধরতে হবে! মামার টাকার জোগাড়–’

‘টাকার জোগাড়েও– নামতে হবে।’

‘নামতে হবে! তবে কেনা-মামা নাকি অধিক দাম পেলেই বেহাত হয়ে যায়। অথচ সঠিক চিনে নিয়ে কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদস্থ লোকের পদ জড়িয়ে ধরতে পারলেই নাকি পদবি-পদক থেকে পদস্থ চাকরি পর্যন্ত সবই সুনিশ্চিত হয়ে যায়। কিন্তু আলমভাই, আপনি কি অতটা পারবেন?’

‘উপায় কি। অপরিহার্য হলে পায়ের ওপরও–পড়তে হবে।’

‘পড়তে হবে! কিন্তু আপনি একটা পা ধরতেই আরেকজন যদি আরেকটা পা ধরে ফেলে, তবে তো ড্র হয়ে যাবারই আশঙ্কা। দুখানি চরণই যদি আপনি  দু’হাতে জাবড়ে ধরে ফেলতে পারেন, তবে আর কোনো রিস্ক্ই থাকে না। কিন্তু ভাই, এতখানি আপনার পক্ষে কি সত্যি বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে না?’

‘না। তুমি তো জানো ভাই, পঁচিশটি বছর ধরে কেবল করণীয়-কর্মের কর্ষণ করতে করতে আমি এক ধরনের অসাধারণ কর্মী হয়ে উঠেছি। অতএব কর্তব্য-কর্মে গাফলতি, সে আমার নয়। চাকরির জন্যে দরকার হলে আমাকে দু’পায়ে মাথা খুঁড়েই–মরতে হবে।’

‘মরতে হবে! একেই বলে কর্তব্যে নিষ্ঠা। এবার দেখছি আমাদের ‘করিবকর্মা’ আলমভাই একেবারে মরণপণ কর্তব্যপরায়ণ। অতএব সেই ‘ভাবতে হবে’ থেকে দেখতে হবে, দিতে হবে, নিতে হবে, ছুটতে হবে, ধরতে হবে, নামতে হবে, পড়তে হবে, মায় ‘মরতে হবে’ পর্যন্ত–তাঁর সঙ্গেকার এই সারগর্ভ সংলাপের সার-সংক্ষেপটাই শুধু অনুমোদন করিয়ে নেবার আশায় নিবেদন করলাম :

‘তাহলে আলমভাই, আপনার চাকরির সব কিছুই এখনো সেই চিরশ্রুত ‘হবে’র স্তরেই রয়েছে। ‘তিন বছর’ আগে হয়েছে শুধু চাকরি করার সিদ্ধান্তটাই।’

‘উপায় কি ভাই! ‘কর্তব্য’কার্য বা ‘করণীয়’কর্ম ছাড়া কাজের মানুষ কি বাঁচতে পারে? তাই একটা কিছু তো আমাকে–করতে হবে।’

‘করতে হবে! এ-আপনার নিতান্তই বিনয় আলমভাই। শুধু আপনাকে কেন এবং কেবল একটা-কিছু কেন, কবির প্রত্যয় ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি’ যদি সত্যই হয়–তবে বাংলাদেশ তো ভবেরই ভবিষ্যৎ। অতএব আমাদের ক্রিয়ামাত্রই তো ভবিষ্যৎকালেই–করতে হবে।

তাঁর এবং আমার দ্বৈতকণ্ঠের স্বতঃস্ফূর্ত উচ্চারণে আলমভাইয়ের বিধেয়টা বাঙলার সকলভাইয়ের বাকি সব শ্লোগানের মতোই শোনাল–মানে, শূন্যগর্ভ বলেই উচ্চকণ্ঠ।

নন্দঘোষ : আবদুশ শাকুর

https://i0.wp.com/media-cdn.tripadvisor.com/media/photo-s/01/22/0c/c6/the-flower-of-a-banana.jpg
জন্মাবধি শুনে আসছি– যতদোষ, নন্দঘোষ। কিন্তু সে হতভাগা-যে আমিই সেটা জানতে পেলাম কেবল পত্নীর মুখে পড়েই। মেয়েটি শুকিয়ে যাচ্ছে কেন? তাজা হাওয়া খাওয়াই না বলে। তার মা মুটিয়ে যাচ্ছে কেন? মোটা ডাক্তার দেখাই না বলে। ছেলেটি হাবা হচ্ছে কেন? তার বাবা পড়ায় না বলে।
অভিযুক্ত আমি পিতার রাজ্যেও হতাম, কিন্তু নিজের গৃহে হই সাব্যস্ত দোষী, অর্থাৎ অ্যালেজ্ড-অ্যাকিউজ্ড নয়, ফাউন্ড-গিল্টি এবং শুনানি-বাদেই। আমার ঘরটিকে ঘিরে অবাঞ্ছিত যা-যা ঘটছে সেসবের জন্যে দোষী অন্য কেউ নয়, সর্বদাই আমি; মানে গৃহস্বামী। এমনকি যা-যা ঘটছে না, সেসবের জন্যে দোষীও একই দাগী আসামী। একটানা নন্দঘোষের ভূমিকায় কোনো রোষেরও উদ্রেক হয় না আর। এমনকি আজকাল তো সামাজিক আসরের অভাবে আমার অশান্তির বাসরে এই দোষী-দোষী খেলা খেলেই এক রকম অন্ধকার আনন্দ আহরণ করতে থাকি আমি। পরিজনের হর্ষ বর্ধন করার দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসেবে আমি তাদের সম্রাট হর্ষবর্ধন। অথচ হর্ষ তো দূরস্থান, এক প্রস্থ ভাঁড়ামিও দীর্ঘক্ষণ খুঁজে না-পেয়ে একদিন আমি ভেবেচিন্তেই একটা নিতান্ত নির্দোষ মন্তব্য করেছিলাম :
‘ভারি বিচ্ছিরি গরম!’
ভাবলাম এ-তো আবহাওয়ার ব্যাপার। এর জন্য নরবিশেষকে দায়ী করা কোনমতেই সম্ভব হবে না। কিন্তু হায়, নারীর রায় তবু চলে গেল আমারি প্রতিকূলে :
‘গরমের দোষ কি? শোবার ঘরের এয়ার-কুলার চুলায় যাক, তুমি বসার ঘরে একটা পেডেস্টালও লাগাতে পারবে না বলে গরম তো তার আপন কাজে আলস্য করতে পারে না তোমার মতো।’
হঠাৎ কালবোশেখীর একটা দমকা এসে ঘরের কোণের কলাগাছটিকে উপড়ে ফেলে দিল। দৃশ্যটি দেখে স্বাভাবিক একটি উক্তিও আমার মুখ থেকে, বলতে গেলে, খসেই পড়ে গেল :
‘এই তো ফের দুর্যোগের দিন এসে পড়ল। এখন কেবল কথায়-কথায় ফোন নষ্ট হবে, কারেন্ট চলে যাবে, পানি থাকবে না– ভোগান্তির একশেষ হবে আর কি!
ভাবলাম, ঝড়বাদলের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ওপর তো মানবিক হাত থাকতে পারে না। সুতরাং দৈব দুর্বিপাকের শিকার ওই কলাগাছটার ব্যাপারে অন্তত এই নরের কোনো অপরাধ খুঁজে পাওয়া যাবে না। তবু নারীর বিচারে আমারি অপরাধ সাব্যস্ত হয়ে গেল :
‘নিজে তো দু-কোদাল মাটি ম্যানেজ করতে পারলে না কলাগাছটির জন্যে। অথচ ইসলামসাহেব? তাঁর পেয়ারা-তলাটা পর্যন্ত বাঁধিয়ে নিয়েছেন এলিফ্যান্ট-ব্র্যান্ড সিমেন্ট দিয়ে। কলাগাছ যার ঘরের ভেতরেই থাকে– তার ক্ষেতে আর কী করে থাকবে কলাগাছ!’
অতিষ্ঠ হয়ে উঠে গিয়ে কিচেনবাগানটা ঘুরে এসে, অত্যন্ত সঙ্গত কারণেই একটা সকরুণ খবর দিতে হল এবং সত্যই ভারাক্রান্ত মনে :
‘কাণ্ডটা দেখেছ? তোমার কিচেনগার্ডেনের আলুক্ষেতটাকে যেন ট্রাক্টর দিয়ে চাষ করে গেছে কোনো আদর্শ চাষী! আহা, কাল বাদে পরশুই তো আলুগুলি তুলে ফেলা যেতো। ফসলটাও ছিল এবার, যাকে বলে, বাম্পার!’
ভাবলাম, এমন মর্মবিদারী অঘটন আর আমার বক্ষবিদারী বয়ান শুনে দিশেহারা গৃহিণী নিশ্চয় ছুটে গিয়ে দেখে আসতে চাইবেন ইঁদুরের তাণ্ডবটা। ইঁদুর দমনের ব্যবস্থায় যেখানে গোটা দুনিয়াই লাচার, সেখানে এই ক্ষুদ্র-মিয়া আমি আর কোন্ ছার। কিন্তু হায় রে বিচার! বিচারপতি পত্নী আমার দ্ব্যর্থহীন রায় দিয়ে দিলেন গৃহপতিরই বিরুদ্ধে :
‘উপড়ে ফেলবেই তো। তোমার সখের শয্যাটিতেও গিয়ে তুরপুন চালাবে। এমন সঙ্গিন গরজেও তুচ্ছ একটা বিড়ালছানা জোগাড় করা তোমার দ্বারা হয়ে উঠল না। আর চৌধুরীসাহেবকে দেখ, কেবলমাত্র সখের বশে আস্ত একটা হরিণশাবক পর্যন্ত কেমন অনায়াসে ম্যানেজ করে ফেললেন।’
এর পরে, তুচ্ছ বিড়ালছানার স্বরে হলেও, ক্ষুদ্র প্রতিবাদ একটা না-করে আর পারলাম না :
‘আচ্ছা, আলুক্ষেতে ইঁদুরের আক্রমণ তো স্বয়ং জাতিসঙ্ঘের বিশেষজ্ঞ-স্বীকৃত একটা আন্তর্জাতিক সমস্যা। তার ওপর, এ-বছর তো আটলান্টিকের এপার-ওপার আর্জেন্টিনা আর পর্তুগালের তামাম আলুগাছ সাবাড় করে তারা– ’
‘থামাও তোমার অসার যত কথার ধারা! ওতে শুধু প্রমাণিত হয় যে, তোমার মত অকর্মণ্য লোকে সমগ্র বিশ্বটাই ভরে গেছে আজ। এবং সেজন্যেই তো আজকের ‘গ্লোবাল ভিলেজ’টিও ইঁদুরের মতো তুচ্ছ ভিলেনদেরই ডেন্ হয়ে পড়েছে।’
অনর্থক মন্তব্যরাজি শুনে আমার মুখ থেকে প্রচণ্ড এক গমক হাসি উপচে পড়ল সশব্দ। কিন্তু সকল শব্দ ছাপিয়ে তদ্দণ্ডেই প্রচণ্ডতর একটা মহাশব্দ যেন লাফিয়ে উঠে এল আমার গেটের সামনের রাস্তা থেকে। শব্দটা ছিল দশটনী একটা চলন্ত ট্রাকের টায়ার-ফাটার। আওয়াজটা শোনামাত্র ভাবলাম শেষ বারের মতো কপালটা আরেকবার ঠুকেই দেখা যাক। অতএব এবারে আর পরোক্ষ মন্তব্য নয়, প্রত্যক্ষ প্রশ্নই করলাম একটা :
‘আচ্ছা, ওই টায়ারটা ফাটার জন্যও আমারি কিছু দোষত্রুটি দায়ী নাকি?’
‘শুধু কিছু? সম্পূর্ণ দোষটাই তো তোমার। তুমি একটা ফাটা-কপাল বলেই তো, তোমার বাসাটা ক্রস করতেই বেচারার ওই দশ-টনী ট্রাকের টায়ারটাও ফস করে ফেটে গেল। এবং এজন্যেই তো এ-ধরনের অপয়াদের কমপক্ষে¬’
‘ডিভোর্স?’
সটান দাঁড়িয়ে দুহাত বাঁকিয়ে কোমরে ঠেকিয়ে মুখোমুখি হয়ে মুখরা রমণী ব্যাখ্যা দাবি করলেন :
‘ডিভোর্স-শব্দটার সঘন চর্চা হয় মনে হচ্ছে?’
‘তা হবে কেন, তোমার কথার স্রোতের টানে– ’
‘আমি তো বলছিলাম ‘কমপক্ষে’ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দানের কথা।’
‘আচ্ছা! যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত দোষী এখনো তবে নই আমি।’

শব্দের পলায়ন –আবদুশ শাকুর

শব্দ দিয়ে ভাষা বোনা, ভাষা দিয়ে সাহিত্য রচনা এটা সাধারণ জ্ঞান। কিন্তু হালের বাংলা সাহিত্যে প্রায়শ শব্দের দিকে নজর না-দিয়েই সাহিত্য রচনা চলে, তাও পর্যাপ্ত পরিশীলন-পরিমার্জন বাদে। অথচ সভ্য মানুষ শব্দ দ্বারা শাসিত, তাঁদের তাবৎ শাস্ত্র শব্দে ক্ষোদিত এবং এই শব্দকে জীবন্ত ও যথাযথ রাখার একমাত্র নিমিত্তই হল রচিত সাহিত্য।
প্রতীচ্য সভ্যতা জুড়ে শব্দের অগ্রগণ্যতা ছিল সুবিদিত। ইংরেজি ভাষায় সপ্তদশ শতকে মিল্টন-যুগের শেষ থেকে অর্থের অন্যান্য সঙ্কেতের চাপে, বিশেষত অঙ্কের, শব্দ থেকে লেখকের পশ্চাদপসরণ শুরু হয়। ভাষাটির ষোড়শ শতকের মাত্র দেড় লক্ষ শব্দসম্ভার থেকে যত বেশি শব্দ শেক্সপিয়ারের ব্যবহারাধীন Continue reading